মেট্রোরেল ঘিরে জমজমাট ভাঙ্গারী সিন্ডিকেটের চুরির ব্যবসা

0
8

নিজস্ব প্রতিবেদকঃদেশের মেগা প্রকল্প ও প্রথম মেট্রোরেল দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিবর্তনের আগেই ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে উত্তরা ও তুরাগের শতাধিক ভাঙ্গারী ব্যবসায়ীর।
কিছুদিন আগেও যারা পায়ে হেঁটে বা ভ্যানগাড়ি ঠেলে গ্রামগঞ্জে ঘুরে বেড়িয়ে পুরাতন মালামাল ক্রয় করতেন তারাই এখন লাখ লাখ টাকার ব্যবসা করে মহাজন বনে গেছেন। এর মধ্যেই শুধু মাত্র চুরির মালামাল ক্রয় করে করেছে গাড়ী বাড়ি ও অগাধ সহায় সম্পত্তি।

চুরির যত প্রক্রিয়াঃ
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে শুধু মাত্র মেট্রোরেলের নির্মাণ সামগ্রী চুরি করে এনে ভাঙ্গারী ব্যবসায়ীদের পর্যন্ত পৌঁছে দিতেই রয়েছে একাধিক চক্র। রয়েছে মেট্রোরেলের মাল চুরি করার জন্য শিশু ও মহিলারাও। তারা মূলত মেট্রোরেলের পিলার গুলোর সাথে যে নির্মাণাধীন মালামাল স্তুপ আকারে রাখা আছে সেখান থেকে সিকিউরিটিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বের করে আনে সরকারী এ মালামাল। অভিযোগ আছে সিকিউরিটি ও আনসারদের যোগ সাজস্যে হচ্ছে এক রাতেই লাখ টাকার চুরি। অন্যদিকে জায়গাটি অনেকটা নিরিবিলি হওয়ায় অল্প অল্প করে মালামাল সরিয়ে রাখা হয় আশেপাশের কাশবনে। পরে রাস্তায় দাঁড় করানো হয় চোর সিন্ডিকেটের কোন এক সদস্যকে যারা পুলিশ আসলেই সংকেত দিয়ে কাশবনের ভেতর ঘাপটি মেরে বসে পরে। পরবর্তীতে সুযোগ বুঝে চুরি করা যন্ত্রাংশ মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়া হয় আশেপাশের ভাঙ্গারী দোকানগুলোতে। এছাড়াও পিকআপে করে গভীর রাতে ডিপো থেকে চুরি করা মালামাল সরানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

যেভাবে ভাঙারি ব্যবসায়ীরা চুরি করা মালামাল ক্রয় করে থাকেঃ

শুধুমাত্র মেট্রোরেলকে ঘিরে জমজমাট হয়ে উঠেছে শতাধিক ভাঙ্গারি ব্যবসা। তাদের মূল চালিকা শক্তিই এখন মেট্রোরেলের চুরি করা মালামাল ক্রয় ও বিক্রয়। বেশ কয়েকটি ভাঙ্গারী দোকান ঘুরে এর সত্যতা মিললো। এসব টিনের চালা বা ঘুপরি ঘরে প্রতি মহাজনই রেখেছেন মেট্রোরেলের যন্ত্রাংস ও লোহালক্কড়। এই দোকানগুলো দিনে বন্ধ থাকলেই খোলা হয় রাতে। মুল টার্গেট মেট্রোরেলের মালামাল। মালামাল চুরি করার জন্য স্বঘোষিত মহাজনরা রীতিমত দাদন দিয়ে পালন করে এসব চোরদের। যারা সরাসরি চুরি করে মালামাল নিয়ে আসে মহাজনদের দোকানে। সেখান থেকেই এসব মালামাল চলে যায় বড় কোন স্টিল কারখানায়।

নাম প্রকাশ ও ছবি না দেখানোর শর্তে আমাদের সাথে কথা বলে সরাসরি চুরিতে অংশগ্রহন করা একজন চোর সিন্ডিকেটের সদস্য। তিনি বলেন এখানে কিছু স্থানিয় লোকজন ও জড়িত‌ রয়েছে। যারা এই কাজের জন্য অর্থ বিনিয়োগ করেছেন আমাদের। পুলিশ কোনো ঝামেলা করে নাকি প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাঝে মাঝে পুলিশ মেট্রোরেলের চুরি করা নির্মাণ সামগ্রী ধরলেও তেমন একটা সমস্যা হয় না কারন ভাঙারি মহাজনরা এসে ছাড়িয়ে আমাদের সবাইকে মালামাল সহ ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। তার মতে, সিন্ডিকেটের একটি অংশ রয়েছে ১৭ নং সেক্টরে ইসকন মন্দিরের পাশে। এরমধ্যে ভাঙ্গারি দেলওয়ারের দুটি দোকান, মনির বিষু ও নূরনবী,সেলিম,নজরুল ওরফে নজু অন্যতম। তাদের নেতৃত্বেই সরাসরি মাঠ পর্যায়ে চুরি করে নজু, ওয়াদুদ, বিল্লাল, রায়হান,বাবু,ইয়াদ আলী ও অন্যান্যরা ।

স্থানিয়রা জানান, এর আগেও মেট্রোরেলের মালামাল চুরির মামলায় আটক হয় নৌজা। তবে পালিয়ে যায় দেলোয়ার। এছাড়াও তারা জানান, আছে উত্তরা ১৩ নং সেক্টরে উত্তরা পশ্চিম থানার উল্টো পাশের রাস্তায় একাধিক ভাঙ্গারী দোকান। উত্তরা ৯ নাম্বার সেক্টরের ৫ নং রোডের ভাঙ্গারী সাইফুলের দোকান। সরেজমিন গিয়ে দেখা গেলো উত্তরা ৯ নং সেক্টরের ৪ নং রোডে ফুটপাতে কয়েকটি ভাঙ্গারী জিনিসপত্র ও মিটারস্কেল নিয়ে বসে আছে সে। পরে ৫ নং রোডের একটি প্লটে গিয়ে পাওয়া গেলো সত্যতা। চোরাই মালামাল ক্রয় সহ সে কিনছে উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসা সামগ্রীর যন্ত্রাংশ। যা কিনা টেন্ডারের মাধ্যমেই ক্রয় করা সম্ভব। এ বিষয়ে ভাঙ্গারী সাইফুল বলেন, মেট্রোরেলের মালামাল ক্রয় করি না এখন। হাসপাতালের বুয়ারা মাঝে মাঝে হাসপাতালের জিনিসপত্র এনে এখানে বিক্রি করে দিয়ে যায়। শুধু মাত্র উত্তরা ৯ নং সেক্টর এলাকায় গড়ে উঠেছে একাধিক ভাঙ্গারীর দোকান। যাদের নেতৃত্বে আছেন কতিপয় নাম সর্বস্ব নেতা।
এদের মধ্যে নজরুল,মজলু ও শাকিল অন্যতম।
নাম না প্রকাশ শর্তে একজন ভাঙ্গারীর দোকানদার জানান, মেট্রোরেলের আশপাশে যত ভাঙ্গারির দোকান দেখেন সব দোকানই মেট্রোরেলের মালামাল ক্রয় বিক্রি করে। মেট্রোরেল তৈরির শুরু থেকে এযাবৎ তারা কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছেন।
মেট্রোরেলের যন্ত্রাংশ বিক্রির চক্রটিকে নিয়ে এর আগে সংবাদ প্রকাশ হলে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। চোরদের বিরুদ্ধে নেয়া হয় আইনগত ব্যবস্থা। কিন্তু
থেমে থাকেনি চক্রটি। প্রতিদিনই দিনে কিংবা রাতে দেদারছে চুরি হয়ে যাচ্ছে সরকারি মেগা প্রকল্পের এসব গুরুত্বপূর্ণ মালামাল।

এ বিষয়ে বাউনিয়া এলাকার সাবেক ইব্রাহীম মেম্বার প্রচন্ড ক্ষোভ নিয়ে প্রতিবেদককে বলেন, এই এলাকার নাম এখন চোরের এলাকা হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। মান সম্মান রক্ষার্থে এখন ঘর থেকে বের হতে পারি না। চোরের কর্মকান্ডে আমরা চড়মভাবে বিব্রত। ইতিমধ্যে আমরা ঢাকা ১৮ আসনের এমপি হাবিব হাসান এর কাছে চোরের তালিকা দিয়েছি। এছাড়াও সামাজিক আন্দোলন করে যাচ্ছি। তবুও চোরদের যেনো থামানো যাচ্ছে না।

ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সহ সম্পাদক আবুল কালাম রিপন বলেন, বর্তমান সরকার উন্নয়নের সরকার। মেট্রোরেলের মত মেগা প্রজেক্টের যন্ত্রাংশ ও মালামাল যারা চুরি করে তারা দেশের শত্রু। তারা চায় বর্তমান সরকারের উন্নয়নকে বাঁধাগ্রস্থ করতে। নেত্রীর বদনাম করতেই এসব নেক্কারজনক কাজ তারা করছে। যারাই এমন কাজের সাথে জড়িত। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।
এ বিষয়ে জানতে তুরাগ থানার অফিসার ইনচার্জ মেহেদী হাসানের সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here